হাংরি আন্দোলন রচনাসংগ্রহ

Thursday, 25 July 2019

বিনয় মজুমদার-এর কবিতা

একটি উজ্বল মাছ
একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে
দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত পস্তাবে স্বচ্ছ জলে
পুনরায় ডুবে গেলো — এই স্মিত দৃশ্য দেখে নিয়ে
বেগনার গাঢ় রসে আপক্ক রক্তিম হ’লো ফল |
বিপন্ন মরাল ওড়ে, অবিরাম পলায়ন করে,
যেহেতু সকলে জানে তার শাদা পালকের নিচে
রয়েছে উদগ্র উষ্ণ মাংস আর মেদ ;
স্বল্পায়ু বিশ্রাম নেয় পরিশ্রান্ত পাহাড়ে পাহাড়ে ;
সমস্ত জলীয় গান বাষ্পিভূত হ’য়ে যায়, তবু
এমন সময়ে তুমি, হে সমুদ্রমত্স্য, তুমি…তুমি…
কিংবা, দ্যাখো, ইতস্তত অসুস্থ বৃক্ষেরা
পৃথিবীর পল্লবিত ব্যাপ্ত বনস্থলী
দীর্ঘ-দীর্ঘ ক্লান্তশ্বাসে আলোড়িত করে ;
তবু সব বৃক্ষ আর পুষ্পকুঞ্জ যে যার ভূমিতে দূরে দূরে
চিরকাল থেকে ভাবে মিলনের শ্বাসরোধী কথা |

আর যদি নাই আসো
আর যদি নাই আসো,ফুটন্ত জলের নভোচারী
বাষ্পের সহিত যদি বাতাসের মতো না-ই মেশো,
সেও এক অভিজ্ঞতা ; অগণন কুসুমের দেশে
নীল বা নীলাভবর্ণ গোলাপের অভাবের মতো
তোমার অভাব বুঝি ; কে জানে হয়তো অবশেষে
বিগলিত হতে পারো ; আশ্চর্য দর্শনবহু আছে
নিজের চুলের মৃদু ঘ্রাণের মতন তোমাকেও
হয়তো পাইনা আমি, পূর্ণিমার তিথিতেও দেখি
অস্ফুট লজ্জায় ম্লান ক্ষীণ চন্দ্রকলা উঠে থাকে,
গ্রহণ হবার ফলে, এরূপ দর্শন বহু আছে ।

বসার পরে

বসা শেষ হয়ে গেলে দেখা যায় ভুট্টা অতি সামান্যই নরম হয়েছে ।
নদী সোজা উঠে পড়ে, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি গ্লাসের বাহিরে
রস লেগে আছে কিনা, নদী তার হাত দিয়ে আমার ভুট্টাটি
তখন -- বসার শেষে ককনো ধরে না, ভুট্টা রসে ভেজা থাকে ।
আমি কিন্তু হাত দিই, ঘাসের উপরে হাত বোলাতেই থাকি,
ঘাস টেনে টেনে দেখি, অনেক অশ্লীল কথা অনায়াসে বলি ।
নদীর গ্লাসের দৃশ্য -- গ্লাসের বাহিরটিকে প্রাণ ভরে দেখি
( গ্লাসের ভিতরে দেখি বসার সময় শুধু ) বসা শেষ হলে
গ্লাস খুলে দেখতে সে এখনো দেয়নি আমি বহির্ভাগ দেখি ।
হঠাৎ বেলের দিকে চোখ পড়ে, মুগ্ধ হয়ে যাই ।
বেল দুটি এ বয়সে অল্পপরিমাণ ঝুলে পড়েছে, সে দুটি
মনোমুগ্ধকর তবু চোখ ফের নেমে আসে নিচের গ্লাসের দিকে, সেই
গ্লাসের উপরিভাগ বসার সময়ে যতো দেখেছি
এখন এতটা নয়, সরু হয়ে পড়েছে, তা ঘাসগুলি ঘন হয়ে পড়েছে এখন ।

অঘ্রাণের অনুভূতিমালা
সকল বকুল ফুল শীতকালে ফোটে, ফোটে শীতাতুর রাতে
যদিও বছর ভর, আষাঢ়ে-আশ্বিনে, চৈত্রে বকুলের নাম শোনা যায়,
শুনি বকুলের খ্যাতি, বকুলের প্রিয়তার সকল কাহিনী
তবু খুব অন্তরঙ্গ মহলেই শুধুমাত্র আলোচিত হয়
তার ঢাকাঢাকি করে এ-সব নরম আর গোপন বিষয় ;
অচেনা মহলে প্রায় কখনোই বকুলের নাম বা কাহিনী
তোলে না, শরমবোধে চেপে যায় যেন কেউ বকুল দ্যাখেনি ;
তবে — তবু আমি জানি সকলেই এ-সকল মনে মনে ভাবে
বড়ো বেশি করে মনে মনে ভেবে থাকে সারাটা জীবন
ভেবে বেশ ভালো লাগে বকুল ফুলের রূপ এবং সুরভি ।
আমাদের সব চিন্তা অদৃশ্য বাস্তব হয়ে পাশে চারিধারে
রূপায়িত হতে থাকে, হয়ে যায়, অবয়বসহ হয়ে যায়,
চলচ্চিত্রাকারে হয়, চিন্তাগুলি অবিকল এমন বাস্তব
বলেই হয়তো এতো ভালো লাগে বকুলের বিষয়ে ভাবনা ।
বকুলের আকারের বিষয়ে ভাবনা তবু বেশি ভালো লাগে
ঘ্রাণ ও রঙের চেয়ে অন্যান্য গুণের চেয়ে ফুলের আকার
চিরকাল সকলেরই অনেক অনেক বেশি ভালো লেগে থাকে–
মাঝখানে বড়ো এক ছিদ্রপথ, ছিদ্রপথ ঘিরে
অনেক পাপড়ি আছে, এলোমেলো সরু সরু পাপড়ি ছড়ানো ;
এই চেহারাটি আমি স্বভাবত সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি
এ-সকল পাপড়িকে অতিশয় সাবধানে নাড়াচাড়া করি,
এখন এই তো এই বকুলবাগানে একা অঘ্রাণের রাতে
নাড়াচাড়া করে দেখি, অতি সাবধানে টানি, ধীরে-ধীরে টানি
যাতে এ-সকল দল ছিঁড়ে বা উঠে না যায় ; কী রকম লাগে,
মনে হয়, মনে পড়ে এতো বড়ো বাগানের শরীরের থেকে
শুধুমাত্র ভালো-ভালো, মূল্যবান জিনিসকে বেছে-বেছে নিয়ে
যে-রকম চর্চা হয়, সৌন্দর্যচর্চার রীতি চিরকাল আছে
তার বিপরীতভাবে গদ্যময়তার থেকে বাদ দিয়ে দিয়ে
সারহীন অঙ্গগুলি সরিয়ে-সরিয়ে রেখে ডালপালা পাতা
একে-একে বাদ দিতে-দিতে শেষে যখন এমন
আর বাদ দিতে গেলে মূল কথা বাদ যায় যার তখন থেকেই
দেখা যায় জোছনায় ফুল ফুটে আছে, এই বকুল ফুটেছে,
দেখা যায় একা-একা অঘ্রাণের জোছনায় আমি ও বকুল,
বকুলের ফাঁকটির চারধারে সরু-সরু পাপড়ি ছড়ানো
অতি সোজা সাদা কথা যেন অবশিষ্টরূপে পড়ে আছে তবু–
তবু এ তো ডাল নয়, তবু এ তো পাতা নয়, এ হলো বকুল ।











মলয় রায়চৌধুরী at 06:29
Share

No comments:

Post a Comment

‹
›
Home
View web version
Powered by Blogger.