হাংরি আন্দোলন রচনাসংগ্রহ

Thursday, 25 July 2019

অরণি বসু-র কবিতা

বিদায়
(উৎসর্গঃ উৎপলকুমার বসু)
নদী পার হয়ে তুমি চলে গেলে একা। অস্তায়মান সূর্য, হাওয়া আর
পাতা ঝরার শব্দ।
ঝুপ করে নেমে এল অন্ধকার। গান থেমে গেছে অবশেষে।
হইচই করতে করতে পাখিরা বাসায় ফিরছে। শীত।
একটা গাছের পাতা ঝরে পড়লে চরাচরে কোনো আলোড়ন হয় না,
শুধু হলুদ পাতাটাই ঘুরতে ঘুরতে নেমে আসে নীচে।

এতক্ষণ আমরা একসঙ্গে ছিলাম। গল্প। মৃদু গান। স্পর্শ।
এখন আমি এপারে দাঁড়িয়ে আছি একা, বেঁচে থাকার শব্দের পাশে-
তুমি নদী পার হয়ে চলে গেছো একাকী। অন্ধকারে।
কুয়াশার জাল ছিন্ন করে বিষণ্ণ, পাগল পিটার প্যান লাফিয়ে নামে জলে।

জলতরঙ্গ
আমাদের টেলিফোন নেই, ফ্রিজ নেই, জলতরঙ্গ আছে।
আমাদের গ্রীষ্মকালীন দার্জিলিং নেই, গাড়িবারান্দা নেই, জলতরঙ্গ আছে।
জলতরঙ্গ বলতে তোমরা কি ভাবছো জানি না,
আমাদের জলতরঙ্গটা মাত্র সাড়ে সাত টাকার,
আমার ছেলের প্রথম জন্মদিনে আমি উপহার দিয়েছিলুম।
তো এই সাড়ে সাত টাকার জলতরঙ্গ নিয়ে এতো কথা কেন ?
আসলে আমাদের জলতরঙ্গটা আর ঠিক জলতরঙ্গ নেই,
ওটা এখন আমাদের বাড়ির রাগ কমানোর যন্ত্র।
আমি যখন কোনো কারণে রেগে গিয়ে চেঁচামেচি করি
তখন আমার স্ত্রী আস্তে আস্তে জলতরঙ্গ বাজাতে থাকে।
আমার স্ত্রী যখন রেগে যায়, প্রায়শই যায়, এমনকি খুব তুচ্ছ কারণেও,
তখন আমি জলতরঙ্গ বাজাতে আরম্ভ করি, আর
যেদিন কলে জল থাকে না, ডাল সেদ্ধ হয় না,
বাজারে মাছের দাম অসম্ভব চড়া কিংবা ঘণ্টার পর ঘণ্টার লোড-শেডিং
সেদিন আমরা দুজনেই, যাকে বলে, একেবারে ক্ষেপে উঠি,
যখন আমরা সমস্ত দাঁত, নখ আর জিভ বার ক’রে
ছুটে যাই পরস্পরের দিকে,
তখন আমাদের ছেলে জলতরঙ্গটা বাজায়।

আশ্চর্য, জলতরঙ্গ বাজতে থাকলেই আমাদের রাগ পড়ে যেতে থাকে,
রাগ পড়ে যেতে যেতে, সত্যি বলছি,
আমরা আবার মুচকি হেসেও ফেলি।
আমাদের টেলিফোন নেই, ফ্রিজ নেই,
আমাদের ফিক্সড্‌ ডিপোজিট নেই, ভালোবাসায় উচ্ছ্বাস নেই,
তবু যে জলতরঙ্গটা আছে, সেই জন্যেই,
হ্যাঁ, সেই জন্যেই, জানো, আমরা এখনো টিকে আছি।
অভিমানের আগে
তুমি অভিমানে ফিরিয়ে দিয়েছ তাই আজ এই অন্ধকারে
তুমুল গর্জনে মাতে সামুদ্রিক হাহাকার।
সৈকত শহর জুড়ে চাপা গুঞ্জরণ ছড়িয়ে পড়ে ক্রমশ।

তোমার অভিমানের বদলে আমি তবে একা হেঁটে যাব অনন্তকাল —
মুঠো খুলি, মুঠো বন্ধ করি।
অন্ধকার, কোলাহল, নিষ্ঠুরতা আর কৌতূহল পেরিয়ে
আমি চলে যেতে চাই অন্য এক পৃথিবীর দিকে।
কল্পতরু
সতরঞ্চি গুটিয়ে তুমিও চলে এসো,
ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দাও পুরোনো যত ক্ষত,
আলো, আলো জ্বলে উঠুক আবার।

সারাদিন কেবল তাংড়ে বেড়াই, সারাদিন কেবল কুড়িয়ে বেড়াই।
জামা করিয়েছি তার অসংখ্য পকেট, প্যান্টেও।
যা কিছু পাই, খোলামকুচি, মণিমাণিক্য পকেটে পুরি,
ঝোলায় ভরি।
বাড়ি ফিরে এসে পকেট উজাড় করে সেইসব সাজিয়ে রাখি ঘরে
বই-এর তাকে থাকথাক করে রাখি বই, আর
নিজের সংগ্রহশালা দেখতে দেখতে মনে মনে ভাবি
একদিন দেবেন ঠাকুর হব।
যার যা খুশি তুলে নিয়ে যাবে ঘর থেকে আর আমি
ক্রমশ প্রত্যক্ষ করব আমার রিক্ত হয়ে যাওয়া।
বড়ো সাধ মনে একদিন দেবেন ঠাকুর হব।
যত প্রিয় বই, পেন, প্রিয় সংগ্রহ, ছবি, বুকের পাঁজর নিয়ে যাবে সব
চেনা-অচেনা, পাড়া-প্রতিবেশী, রাস্তার লোক।

এইভাবে দিন যায় আর ঘরের পরিসর সংগ্রহের চাপে
প্রতিদিন আরও ছোটো হয়ে আসে। একদিন পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়লে
মুচকি হেসে নিজেকে বলি, ‘কি হে কবে হবে দেবেন ঠাকুর?’
হাই তুলতে তুলতে পাশ ফেরার আগে নিজেকেই উত্তর দিই,
‘আর কটাদিন সবুর করো, আরও কিছু জমিয়ে নিই।’









মলয় রায়চৌধুরী at 05:59
Share

No comments:

Post a Comment

‹
›
Home
View web version
Powered by Blogger.